কাজের প্রসঙ্গে নবীজি

ঘরের কাজ পরের কাজ নয়, নিজের কাজ। যে সংসার নিজের, তার কাজও নিজের। আমরা এগুলো মুখে বলি, কাগজে লিখি, কিন্তু প্রায়োগিক জীবনে আমরা এসবে নিজেদের অভ্যস্ত করি না; কিবা কেউ করেও-বা যদি, তাহলে কাজের সার্থকতা বা লোকের কাছে বলে বেড়ানোর ঝোঁক তার রয়ে যায়; এবং সে এর মধ্যেও খুঁজতে থাকে অভিনন্দিত হবার আকাঙ্ক্ষা; হয়তো কোনো-কোনো বিবেচনায় এগুলো খুব নিন্দনীয় ব্যাপার নয়, কিন্তু তিনবেলা আহার, নিয়ম করে গোসল, জামা-কাপড় পাল্টানো—এসব কাজের ব্যাপারে আমাদের যেমন কোনো অর্জনমুখিতা থাকে না, ঠিক সেভাবে ঘর-গেরস্থালির কাজ করেও আমাদের ভেতর অর্জনমুখিতার কোনো ঝোঁক না-থাকা বাঞ্ছনীয়; বরং প্রাত্যহিক সকল নিয়মমাফিকতার মতো এগুলোকেও একই আওতায় রাখা দরকার।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুব অনায়াসে ঘরের কাজে পাওয়া যেতো। এমন নয় যে, ডুমুরের ফুলের মতো হঠাৎ একদিন তিনি ঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন—এমন নয়; সবসময়ই তিনি ঘরের কাজ করতেন। নিজের কাজ মনে করে করতেন।

আসওয়াদ রা. বলেন, ‘আমি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে কী করেন? আয়েশা রা. বলেন, ঘরের কাজবাজে ব্যস্ত থাকেন। যখন নামাযের সময় হয়, নামায পড়তে যান।’ এখানে লক্ষ্যণীয়, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করেন, এই জবাবে আয়েশা রা. এমন কোনো গুরুভার-জাতীয় কাজের কথা বলেননি, যা অন্যান্য সাধারণ মানুষের জন্য মস্ত কোনো ব্যাপার; বরং তিনি খুব সাদামাটাভাবে জানিয়েছেন ঘরে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজের বিষয় কী। আয়েশা রা.-এর এই জবাব দিয়ে বোঝা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের কাজের কতটা নিজের কাজ ভাবতেন এবং তা নিয়মমাফিক তা করতেনও। আয়েশা রা. আরও বলেছেন, তিনি নিজ হাতেই জুতা ও জামা সেলাই করতেন। তিনি তো তোমাদের মতোই মানুষ। তিনি কাপড়ে তালি লাগান। বকরির দুধ দোহান আর নিজের যত্ন নেন।

তিনি ছিলেন খুবই আধুনিক মানুষ,—তবে আধুনিকতা বলতে যে ঝাঁ-চকচকে চিন্তার সিনেম্যাটিক গ্রাফ আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে, এরকম মিথ্যা ও হাস্যকর আধুনিকতার পন্থী তিনি ছিলেন না; মূলত তাঁর জীবনের প্রতিটি কাজেই, যা-তে যা প্রয়োজন, তার এমন অভাবিত ও পরিমিত উপস্থিতি ছিলো, যে, অবাক হয়ে থাকতে হয়; আসলে তাঁর জীবনের প্রতিটি বাকডোরই ছিলো আধুনিকতার এক নতুন পত্তন,—তিনিই সেই অভাবিত আধুনিকতার রূপকার। এই আধুনিক মানুষটি কারও গলগ্রহ হওয়া পছন্দ করতেন না। নিজের সব কাজ নিজে করতেন। যা তিনি নিজে পারেন না, তা অন্য কাউকে করতে বলতেন না।

একবার তাঁর কাছে কিছু লোক এলেন। যাঁরা তাঁর দীক্ষা নেবেন। হয়ে উঠবেন সাহাবী। তিনি তাঁদের বাইয়াত করলেন। বললেন, ‘মানুষের কাছে কিছু চেয়ো না।’ প্রথমে এই নসিহতটি পড়ার পর আমাদের মাথায় চাওয়ার প্রসঙ্গ হিসেবে টাকা-পয়সা বা অন্য কোনো বৈষয়িক বিষয়ের কথাই মনে পড়ে, কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আমাদের চেয়ে সাহাবায়ে কেরামই ভালো বুঝতেন। যিনি এই বাইয়াতের ঘটনা বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, বাইয়াত-নেওয়া সাহাবীদের একজনের হাত থেকে তাঁর ঘোড়ার চাবুক পড়ে গেলো; তিনি কাউকে তা তুলতে বলে না-বলে নিজেই তুলে নিলেন। চাওয়া-র প্রাসঙ্গিকতা যে কত দূর বিস্তৃত সাহাবীর এই আমল দেখে বোঝা যায়।

আপাত চিন্তায় মনে হতে পারে, তাহলে কি মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিক যে দায়বদ্ধতা, তা কি কমে যাবে না? একদমই না। বরং যখন আমরা প্রত্যেকেই নিজের কাজকে নিজের কাজ বলে ভাববো ও করবো, তখন আমাদের মধ্যে আত্মনির্ভরতা আসবে, আসবে স্বাবলম্বিতা, এমনকি আসবে অপরকে সহযোগিতা করার ত্যাগী মনোভাব; কিন্তু বর্তমান যে পরিবেশে আমরা জীবন কাটাই, তাতে অলিখিত নিয়মের মতো একা একজন—হয়তো-বা তিনি ঘরের কর্তা বা কর্ত্রী—সকলের কাজ করে জীবনপাত করতে থাকেন; এতে যেমন তাদের জীবন না-শেষ-হওয়া অবিশ্রান্ত জুলুমের মধ্যে থাকে, অপরদিকে নষ্ট হতে থাকে অনেকগুলো মানুষের আত্মনির্ভরতা ও স্বাবলম্বিতার মতো নিজের দু পায়ে দাঁড়ানোর অতি মূল্যবান নেয়ামত, নষ্ট হতে থাকে অপরকে সহযোগিতা করার ত্যাগী মনোভাবও। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো মানব-সমাজের ভালো-মন্দ উন্নয়ন-অধঃপতন সবচেয়ে ভালো বুঝতেন—এবং তা বুঝেই তিনি—ঘরের হোক বা বাইরের—নিজের কাজকে নিজের কাজই ভাবতেন এবং তা করতেন।

ঘটনাসূত্র : সহীহ বুখারী, ফাতহুর রাব্বানী।